আবার জিম্মি-কৌশল

আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০১৯, ১৪:০৬

নতুন সড়ক আইন কার্যকরের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্ধ রাখা হয়েছে বাস চলাচল। সীমিত হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দূরপাল্লার পথে গণপরিবহনও। এমনকি ঘোষণা ছাড়াই বাংলাদেশ-ভারত রুটে চলাচলকারী বাস বন্ধ রাখারও আয়োজন করা হয়েছে। আজ থেকে পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। এতে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।

গণপরিবহনের ঘাটতিতে মানুষ গন্তব্যে যেতে বিকল্প বাহন ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। পূর্ব ঘোষণা ছাড়া বাস বন্ধ করে দেওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেকেই। অটোরিকশা, ইজিবাইক, টেম্পো, মাহেন্দ্র ও ভ্যানের ওপর ভরসা করতে হয়েছে কয়েকগুণ অতিরিক্ত ভাড়ায়। তার পরও কাক্সিক্ষত গন্তব্যে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন সর্বসাধারণ। রাজধানী ঢাকাতেও গতকাল গাড়ি চলাচল ছিল কম। বিশেষ করে গণপরিবহনের ঘাটতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মূলত বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাস-মিনিবাস কমে যায়। কাগজপত্রে ত্রুটি থাকা এবং পরিবহন নেতাদের উসকানি-এ দুই কারণেই এমন অবস্থা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

সরকারের পক্ষ থেকে এ পরিস্থিতিতে পরিবহন নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে বিভিন্ন পর্যায়ে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মাধ্যমে জেলাপর্যায়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টা চলছে।

আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে গাড়ি চলাচল শুরুর ঘোষণা দেন পরিবহন নেতারা। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে এখনো সমাধান হয়নি। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে গতকাল রাতে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের কয়েকজন নেতার সঙ্গে নিজের মণিপুরী পাড়ার বাসায় বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তবে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সে বৈঠক শেষ হয়। তবে আজ বুধবার বিকালে আবার আলোচনার টেবিলে বসবে দুপক্ষ। এতে যোগ দিতে সারাদেশ থেকে নেতারা ঢাকায় আসছেন বলে জানা গেছে।

শ্রমিক নেতারা অবশ্য বলছেন, তাদের দাবির বিষয়ে সন্তোষজনক ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে।
শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের শুরু থেকে বিরোধিতা করে আসছিলেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। গত সোমবার থেকে আইন কার্যকর শুরুর পর কোনো চাপে পিছু হটবেন না বলে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেওয়ার পর পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা দৃশ্যত চাপ বাড়িয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদ গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন আইন স্থগিত রাখাসহ নয় দফা দাবিতে বুধবার (আজ) থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ডেকেছেন। অন্যদিকে জামিনযোগ্য শাস্তি ও জরিমানা কমানোসহ ৮ দফা দাবিতে গতকাল বিকালে বিআরটিএর চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। তবে এ স্মারকলিপি এর আগে মন্ত্রণালয়েও দেওয়া হয়েছে বলে জানান সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী।

তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ভয় দেখিয়ে আইন কার্যকর করা যাবে না। আইন সংশোধন করতে হবে-এটাই বলে আসছি বারবার। তিনি জানান, জামিনযোগ্য করতে হবে ধারাগুলো। তা ছাড়া কমাতে হবে শাস্তির পরিমাণ। পার্কিং বা ‘বাস বে’ নেই ঢাকা শহরে। অথচ গাড়ি থামালেই ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তা ছাড়া দুর্ঘটনা ঘটলেই ৫ লাখ টাকা জরিমানা, ৫ বছরের জেল এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কর্তনের কথা বলা হয়েছে। এমন আইন থাকলে কেউ রাস্তায় গাড়ি চালাতে সাহস পাবে?
দেখা গেছে, নতুন সড়ক আইন কার্যকরের আগ থেকেই পরিবহন নেতারা শ্রমিকদের মধ্যে ভীতি ঢোকানোর চেষ্টা করেন। গাড়ি চালালেই জেল, ফাঁসি-এ রকম তথ্য প্রচারের মধ্য দিয়ে সাধারণ চালকদের গাড়ি চালনায় নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

 

বলা হচ্ছে, দুর্ঘটনা ঘটলে ফাঁসি দেওয়া হবে। অথচ নতুন আইনে এ ধরনের কথা বলা নেই। হাজার-হাজার টাকা জরিমানার কথাও প্রচার করে চলেছেন নেতারা। তাদের উদ্দেশ্য-এর মধ্য দিয়ে সারাদেশে যান চলাচল বন্ধ রাখা। মানুষকে দুর্ভোগে ফেলার মধ্য দিয়ে জিম্মি করার এ অপচেষ্টা বহুদিনের। এবারও একই রকম হাতিয়ার ব্যবহার করছে পরিবহনকর্মীরা। ধর্মঘট, স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি-এ রকম বিভিন্ন নামে সারাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা অচল করার পাঁয়তারা করছে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিরা।

গাড়ি বন্ধ রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে বরাবরই পরিবহন নেতারা বলেন, জেল থেকে বাঁচার ভয়ে রাস্তায় গাড়ি বের করছেন না শ্রমিকরা। সেখানে মালিক-শ্রমিক নেতাদের হাত নেই বলে দাবি করলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

এর মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদ গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন আইন স্থগিত রাখাসহ নয় দফা দাবিতে বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ডেকেছে।

ঢাকার তেজগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাক মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদের আহ্বায়ক মো. রুস্তম আলী খান বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইন স্থগিত করে মালিক-শ্রমিকদের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জরিমানার বিধান ও দণ্ড উল্লেখ করে একটি যুগোপযোগী বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানভিত্তিক সঠিক আইন প্রণয়ন করতে হবে।’

ট্রাক মালিক-শ্রমিকরা সড়ক পরিবহন আইন প্রত্যাখ্যান করছে কিনা-এ প্রশ্নে রুস্তম বলেন, তারা পুরো আইন প্রত্যাখ্যান করছেন না। কিছু ধারার সংশোধন চান। আইনের সব ধারা নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই। কিছু বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় দাবি জানিয়েছি। কিন্তু সরকার আশ্বস্ত করলেও পরে সেগুলো বাস্তবায়ন করেনি। এ কারণেই কর্মসূচি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় চালককে এককভাবে দায়ী করা যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কোনো মামলায় চালককে আসামি করলে তা অবশ্যই জামিনযোগ্য ধারায় হতে হবে। তদন্তসাপেক্ষে প্রকৃত দোষী চিহ্নিত করার কাজে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের যুক্ত করতে হবে। এ কমিটির মাধ্যমে সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো গাড়ির মালিককে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা যাবে না।

 

এ ছাড়া ‘সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা কমিটি’, ‘সড়ক পরিবহন আইনশৃঙ্খলা কমিটি’ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় গঠিত পণ্য পরিবহনসংশ্লিষ্ট যে কোনো কমিটিতে বাংলাদেশ ট্রাক-কভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদের প্রতিনিধি রাখার দাবি জানান নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সদস্য সচিব তাজুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক মকবুল আহমদ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. মনিরসহ পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা উপস্থিত ছিলেন।

পণ্যবাহী যানের নেতাদের ধর্মঘট আহ্বান এবং সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দাবিসহ বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান আমাদের সময়কে বলেন, আইন গত রবিবার থেকেই কার্যকর। পরিবহনকর্মীদের অহেতুক ভয় পাওয়ার কারণ নেই। নিয়ম মেনে গাড়ি চালালে কোনো সমস্যাই নেই। সব দেশেই আইন থাকে। কেবল গণপরিবহন নয়Ñ ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক, চালক, যাত্রী, পথচারী সবার জন্যই আইন প্রযোজ্য।

কিছু পরিবহন শ্রমিকনেতারা ধর্মঘট ডাকেননি দাবি করে বলেছেন, নতুন কঠোর আইনে ভীত হয়ে চালক-শ্রমিকরা বাস চালাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। শ্রমিকনেতা ওসমান আলী দাবি করেন, তারা ধর্মঘট ডাকেননি।

এদিকে সারাদেশে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সড়কে নেমে দুর্ভোগে পড়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। গাজীপুরে পরিবহন শ্রমিকরা গতকাল মঙ্গলবার সকালে সড়কে নেমে বিক্ষোভ করলেও দুই ঘণ্টা পর উঠে যায়। সোমবার সকাল থেকে খুলনা অঞ্চল, রাজশাহী ও শেরপুরে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, গতকালও সেখানে বাস চলেনি। নতুন করে ময়মনসিংহ, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতেও বাস চলাচল বন্ধ রেখেছে শ্রমিকরা।

নতুন সড়ক আইন সংশোধন না করার প্রতিবাদে খুলনায় দ্বিতীয় দিনের মতো বাস চালকরা কর্মবিরতি পালন করেছেন। খুলনা থেকে রাজধানী ঢাকাসহ অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ ছিল। যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। চাপ বাড়ে ট্রেনে। তবে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেওয়ায় আজ বুধবার সকাল থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচল শুরু হবে বলে জানা গেছে।
রাজশাহীতে নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে গত সোমবার ‘অঘোষিত’ ধর্মঘট পালন করেন পরিবহন শ্রমিকরা।

সংশোধনের দাবি রেখে গতকাল মঙ্গলবার থেকে আবার রাস্তায় বাস নামিয়েছেন শ্রমিকরা। শ্রমিকরা বলছেন, গলায় দড়ির ভয় রেখে রাস্তায় বাস চালানো সম্ভব নয়। তারা দ্রুত আইন সংশোধনের দাবি জানান। জেল-জরিমানার ভয়ে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন বরিশালের পরিবহন শ্রমিকরা।

মঙ্গলবার বেলা ১১টার পর থেকে বরিশালের অভ্যন্তরীণ ৮টি রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। আকস্মিক বাস চলাচল বন্ধের ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। একই কারণে পিরোজপুরের সব রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাস শ্রমিকদের অভিযোগ, রাস্তায় অবৈধ যান চলাচল বন্ধ না করে নতুন এ সড়ক পরিবহন আইনের মাধ্যমে দুর্ঘটনার সব দায়ভার শুধু তাদের ওপরই চাপানো হয়েছে।

তা ছাড়া নওগাঁয় তৃতীয় দিনের মতো বাস ধর্মঘট চলে গতকালও। জেলার বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে ১১টি উপজেলার সব রুটের মেইল ও লোকাল বাস চলাচল বন্ধ ছিল। বন্ধ হয়ে যায় রাজশাহী ও বগুড়া রুটের বাস। ফলে দূরপাল্লার রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। তা ছাড়া মাদারীপুর, কুষ্টিয়ার মেহেরপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, দিনাজপুরের হিলিসহ বিভিন্ন স্থানে দুর্ভোগে পড়েন মানুষ। হিলি-বগুড়া রুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন চালক ও মালিকরা।

এতে বিপাকে পড়েছেন ওই পথে চলাচলরত বাসযাত্রীরা। তবে গতকাল সকাল থেকে গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ করে ৩-৪টি গাড়ি চলাচল শুরু করেছে।

অন্যদিকে বাস শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলছেন, তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বাস চলাচল বন্ধ করা হয়নি। তাদের গাড়ি ও চালকদের সঠিক কাগজপত্র না থাকায় তারা বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন। অন্যদিকে বগুড়ায় আবারও অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃজেলার ৬টি রুটের চালকরা বাস চলাচল বন্ধ করেছেন। মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে বাস চলাচল বন্ধ করায় বিপাকে পড়েন যাত্রীরা।